Home / Articles / ইমিগ্রান্ট কড়চা, আসমা খান, Immigrant Diary (Visit), Asma Khan

ইমিগ্রান্ট কড়চা, আসমা খান, Immigrant Diary (Visit), Asma Khan

ইমিগ্রান্ট কড়চা, আসমা খান, Immigrant Diary (Visit), Asma Khan

আমার বয়সী যারা কানাডার শীতে ঘর বন্দী, তাদের সবচেয়ে নিকটতম সঙ্গী হচ্ছে মন খারাপের ব্যামো। সেটাকে মেরামত করার জন্য এবছর জানুয়ারীর মাঝামাঝি আমি ঠিক করলাম সৌদি আরবের মক্কায় গিয়ে পবিত্র কাবা ঘরে সাত চক্কর দিয়ে আসি। কিন্তু তাতে আবার ফ্যাঁকরা আছে, হাস্পাতালে ডাক্তারের সাথে পরামর্শ, আমার কাজ-পাগোল স্বামীর বিভিন্ন জরুরী মিটিং ফিটিং ইত্যাদি বিবেচনা করে তাকে রাজী করানো সে এক বিশাল ঝক্কির কাজ। আর শীতল মেরু অঞ্চল থেকে উষ্ণ মরু অঞ্চলে যাওয়ার আগে সাতপাঁচ ভাবতে হয় কারন এখন গরমে শ্বাসকষ্ট, বুক ধড়পড় করে, মনে হয় গায়ের চামড়া যেন পুড়ে যাচ্ছে। সেখানে ঝপ করে গরম পড়ার আগেই যেতে হলে রীতিমত হুলুস্থুল করেই যেতে হবে।

বিশ বছর আগে মধ্যপ্রাচ্য ছেড়ে এসেছি, কিন্ত সেখানে কাটানো প্রায় দেড় যুগ সময়ের স্মৃতি বড় উজ্জ্বল। বাহরায়েন ছোট্ট এক দ্বীপদেশ, আশির দশকে সমুদ্রের মধ্যে দিয়ে ‘কজ-ওয়ে’র মাধ্যমে সৌদী আরবের দাহরানের সাথে যুক্ত হবার পর যেকোন ছুটি-ছাটায় আমার স্বামীর ‘উঠলো বাই তো চল মক্কা মদীনা যাই’। সেসময় ভিসার গ্যাঞ্জাম এত জটিল ছিল না ওখানকার ভার্সিটি প্রফেসরদের জন্য। সঙ্গে জুটে যেত আরো কতক বন্ধু পরিবার আর খান কতক গাড়ির কাফেলা। হাজার দুয়েক মাইল পথের পাশেই ছড়িয়ে ছিটিয়ে খানিক পর পর পেট্রোল ষ্টেশনের সাথেই থাকতো সাশ্রয়ী মোটেল, আর খাবার দাবারের ব্যাবস্থা। দিন সপ্তাহ বা মাস তো বটেই, কয়েক ঘন্টার জন্যও ঐ সব মোটেল ভাড়া নেয়া যেত লং ড্রাইভের ফলে ঝিম ধরা হাতে পায়ের গিট্টু খোলার জন্য। সপরিবারে বছরে চার পাঁচবার ‘ওমরা’ করা কোন ব্যাপার ছিল না তখন।

তো সময়ের সাথে সাথে বদলে গেছে বহু কিছু। মাথা ঠান্ডা করে ক্যালেন্ডারে দিন তারিখ গুনে দেখি হাতে আছে দশ এগারো দিন। কাজের শুরুতে যত কঠিন মনে হয়, আসলে অত কঠিন নয়। নিজে নিজেই অন-লাইনে এয়ার কানাডা ওয়েব সাইট থেকে অটোয়া জেদ্দা প্লেনের টিকিট কেনা কোন ব্যাপারই না। সৌদী ‘ওমরা’ ভিসাঃ এজেন্ট লাগবে, অটোয়ার ডাউন টাউনে তাদের অফিস, ফোনেই জানা গেল কি কি লাগবে ভিসার জন্য। ‘ম্যানিঞ্জাইটিস’ ইঞ্জেকশান দেয়া লাগবে, প্লেন টিকেটের মতই দর দামে হের ফের আছে ফার্মেসি গুলোয়। অটোয়াতে বসেই বুকিংডটকম গিয়ে পছন্দ মাফিক হোটেল মক্কা মদিনাতে বুক করা খুব সহজ। ডাক্তার ইঞ্জেকশান দিয়ে সার্টিফিকেট দিলে সেটা সহ প্রয়োজনীয় সমস্ত কাগজপত্র নিয়ে ভিসা এজেন্টের কাছে জমা দেয়ার পাঁচ দিনের মাথায় ভিসা পেলাম।

পয়লা ফেব্রুয়ারী দুপুর বারোটায় অটোয়া থেকে এয়ার কানাডায় রওনা দিয়ে মন্ট্রিয়েল, ফ্রাংকফার্ট হয়ে জেদ্দা। ট্যাক্সি নিয়ে দোসরা ফেব্রুয়ারী রাত্রি নয়টায় মক্কায় হোটেলে উঠলাম। আমি বাসা থেকেই ‘এহরামের নিয়ত ও পোষাক পড়ে রওনা হোলেও আমার স্বামি প্লেনে জেদ্দা থেকে ঘন্টা দুয়েক দূরে ‘এহরাম’ বাধলেন। রিচুয়াল সম্পর্কে আমি বিশেষ আলোচনা না করে উল্লেখযোগ্য ব্যাপার গুলি ছুঁয়ে যাব। আমেরিকান ডলারের সাথে সৌদি রিয়াল দামের অনুপাত নির্দিস্ট, কারেন্সি এক্সচেঞ্জে খুব একটা হেরফের হয়না, তবে সৌদিতে অর্থ বিনিময়ে এখানকার মত সার্ভিস চার্জ নেই।

পৃথিবীর যে কোন মেগাসিটির মতই মক্কার খোল নলচে বদলে দিয়েছেন ইবনে সৌদ এবং তাঁর স্বনামধন্য পুত্রগন। বিশাল বিশাল অট্টালিকা, পাঁচ তারকা হোটেল, ব্রান্ড-নেমের বিজনেস, সুলভ প্রযুক্তি, চমৎকার হাইওয়ে ও যোগাযোগ ব্যাবস্থা, দিন কতকের জন্য আধ্যাত্বিক্তার সাথেই বিলাসী জীবন যাপনের অনায়াস আয়োজন! পুরনো সেই দিনের মত ‘রথ দেখে কলা বেচা’র মত নয়। আধ্যাত্বিকতার প্রতীক কাবাকে কেন্দ্র করেই সর্বত্র ‘ট্যুরিজমের’ জয় জয়াকার। বিশাল পাঁচ তারকা হোটেলের বিলাসিতার মান বরাবরের মত অক্ষুন্ন রাখে নিজেদের গরজেই। কাবা চত্তরেই মালপত্র রাখার ‘লকার’ আছে, কেউ চাইলে সেখানে মাল ছামান নিরাপদে রেখে ওমরা করতে পারেন অনায়াসেই। ফেব্রুয়ারীর প্রথম সপ্তাহে হিসেব মত অফ-সিজেন, কিন্ত গিয়ে দেখি লোকে লোকারণ্যে! বিশেষ করে বৃহস্পতি বার এশার পর যেন জোয়ারের মত মানুষ চলে আসে। দুটো জুম্মা পেয়েছি কাবাঘরে, ভাগ্য খুব ভালো চমৎকার ইংরেজি বলা আরব মহিলা ছিলেন আমার পাশেই, খুব পাওয়ারফুল খোৎবাটির সারাংশ অনুবাদ করে দিলেন।

কাবাঃ সেই কোন অনাদি কাল থেকে অলৌকিক ধর্মীয় বিশ্বাসের স্থাপনা হিসেবে এই ধু ধু মরুভুমিতে প্রতিদিন হাজার হাজার মুসলমানকে অনুপ্রানিত করছে! বহু দূর দুরান্ত থেকে ভঙ্গুর অতৃপ্ত আশাহত মন নিয়ে মানুষ আসে আত্বার প্রশান্তির জন্য, বিশ্বাস হচ্ছে শক্তির মত। আকুল হয়ে মানুষ তার আপনজনের জন্য মঙ্গল কামনা করে, জান মালের হেফাজত চায়। কৃতকর্মের জন্য অনুতপ্ত হয়ে হয় ক্ষমা প্রার্থী। পার্থিব সমস্ত প্রাপ্তির জন্য জানায় কৃতজ্ঞতা। কাবা ঘরের আশে পাশ প্রচন্ড ভিড়, কিছু মানুষ ভক্তির এমন বাড়াবাড়ি আতিশয্য রীতিমত সীমা ছাড়িয়ে যায়। তোয়াফের সময় দেখি এমন এক ভক্তকে মোকামে ইব্রাহীমে  এমন চিল চিৎকারে কাদছেন যে পাশের আরব অত্যান্ত শান্ত স্বরে তাকে সান্তনা দিচ্ছেন ।  আমাদের তওয়াফ শেষে প্রায় মধ্য রাতে তখনও অনেক ভিড়, তা এড়ানোর জন্য আমি কাবা চত্বরেই নামাজ পড়ে চেয়ারে বসে আছি, সামনে তাকিয়ে দেখি মানুষের জোয়ার, আবাল বৃদ্ধ বনিতা সাদা, কালো, বাদামী, হলুদ সক্ষম অক্ষম সারা বিশ্বের মানুষ পরম শ্রদ্ধায় নগ্ন পায়ে কাবা ঘরকে প্রদক্ষিন করছে। হটাৎ শুনি কে যেন অত্যন্ত আন্তরিক স্বরে বাংলায় সজোরে দোয়া করছেন ‘আল্লা মাবুদ আমার গুনাগাথা মাফ কইরা দেও, আমার পরিবারকে হেফাজত করো, ও আল্লা  একটা বড় কাম হাতে লইছি, ঐডা শ্যাষ করার হিম্মত দিও’। তাকিয়ে দেখি পৌঢ় এক ভদ্রলোক কাবার দিকে হাত তুলে অকপট বিশ্বাসে অধীর প্রত্যাশায় একাগ্র মনে দোয়া করছেন।

প্রথম প্রথম চোখে খুব লাগতো কাবাঘরে তোয়াফরত অবস্থায় যখন তখন আশে পাশে হটাৎ করে ‘সেলফি’ তোলার হিড়িক দেখে। ভাষার দেয়ালে হোচট খেতে হয়েছে খুব (আরবী একমাত্র ভাষা)। মাত্র গুটিকয় গেট খোলা ছিল হারাম শরিফের, কাবাঘরের সামনে নামাজ পড়ার ইচ্ছে থাকায় পার হতে হয়েছে হোটেল থেকে খাড়া পাহাড়ি হারামে যাবার পথ, বিশাল হারাম চত্তর, তার পর মসজিদের এক্সটেনশন তারপর সাবেকী মসজিদ। হাটার এই কৃচ্ছতা ছাড়াও আছে হারামে মেয়েদের বাথরুম অনেক দুরে। অনভ্যস্ত পেটে তিনবেলা কেনা খাবারের কষ্ট। মক্কা থেকে মদিনার পথে দুবাই থেকে আসা চমৎকার ইংরেজী বলা মধ্য  ত্রিশের এক আরব মহিলার সাথে আলাপ হোল, সে অদ্ভুতরে এক প্রশ্ন করে বসলো, ‘ছেলে মেয়ে ঘর ছেড়ে চলে যাওয়া শুন্য ঘরে তোমার এজীবন কেমন করে কাটাও?’ আমি চমকে তার চোখের দিকে তাকাই, কিছু কিছু চোখ আছে, যা মনের আয়না, একেবারে তলদেশ পর্যন্ত দেখা যায়, তাকিয়ে দেখি কি এক কষ্ট সেখানে টল টল করছে!

‘সাপটকো’র ভি আই পি বাসে মদিনাতে গিয়ে সন্ধ্যায় পৌছাই। মসজিদের কনস্ট্রাকশন শেষ হয়ে যাওয়ায় মদিনা অনেক সুশৃংখল। নিরাপদেই রসুলুল্লাহর (দঃ) রওযা জিয়ারত, রিয়াযুল জান্নাতে নামাজ আদায়ের চমৎকার ব্যাবস্থা আছে হুইলচেয়ারে। মদিনা মসজিদের আর্কিটেকচার এত সুন্দর মন ভরে যায়। অদ্ভুত এক প্রশান্তি নিয়ে অটোয়ার পথে রওয়ানা হলাম।

About admin

Check Also

give1-300x76

ইমিগ্রান্ট কড়চা (CBET), আসমা খান Immigrant Diary (CBET), Asma Khan

ইমিগ্রান্ট কড়চা (CBET), আসমা খান Immigrant Diary (CBET), Asma Khan স্কুলে আমাদের পন্ডিত স্যার বাংলা …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *