Home / Articles / 26th March , 1971, Asma Khan; ২৬ শে মার্চ, ১৯৭১ সাল, আসমা খান, অটোয়া

26th March , 1971, Asma Khan; ২৬ শে মার্চ, ১৯৭১ সাল, আসমা খান, অটোয়া

26th March , 1971, Asma Khan; ২৬ শে মার্চ, ১৯৭১ সাল, আসমা খান, অটোয়া

 

সত্তুরের নির্বাচনে পুর্ব দেখায় দারুন খেল

বিপুল ভোটে মুজিব জিতে আনন্দে উদ্ধেল।

ব্যাপার দেখে ভুট্টো বলেন ‘শোন টিক্কা খান,

পাকিস্তান মানেই পশ্চিম; আমিই সমাধান!

 

প্রধান মন্ত্রির আসন খানা শিকেয় রইলো তোলা,

মোড়ে মোড়ে সৈন্য ঘোরে ব্যারাক দুয়ার খোলা… … …

 

আজো মনে পড়ে। আমি তখন ক্লাস টেনে পড়ি। মার্চের মাঝামঝি থেকেই চৈত্রের দাব দাহ, পুকুরের পানি শুকিয়ে গেছে, বাতাসটাও যেন আগুনের হল্কা। স্কুল, কলেজ, অফিস, আদালত, দোকান পাট সব অসোহযোগে বন্ধ, অলস ঝিমানো দিন। বছরের শুরুর দিন গুলি ছিল উৎসাহ আর উদ্দিপনার, ইলেকসনে  জয়ের আনন্দে। তখন আমাদের দেশটির ছিল অন্য নাম, পুর্ব পাকিস্তান।

সেই ‘৭১ এর ২৬ শে মার্চের সকালে হোল কি, আব্বা অন্যান্য দিনের থেকে আগেই খালি হাতে বাসায় এলেন,  বাজারের মানুষজন বড়  কোন দুর্ঘটনার আশঙ্খায় ভীত সন্ত্রস্ত। আমরা প্রতিদিনের মত অপেক্ষায় ছিলাম দৈনিক বাংলা, ইত্তেফাকের জন্য। অসহযোগের  সেই সব উদ্দিপনার মনঃ মাতানো খবর যা আমাদের মনে তখন উৎসাহের জোয়ার বইয়ে দিত। যদিও তখন আব্বা চাচাদের মুখ থম থম করত অনিশ্চিত দিনকালের জন্য। বাতাশে খবর ভাসে কোনটা খবর আর কোনটাযে গুজব বলা মুস্কিল।

আমাদের বাসার সামনে বেশ খানিক খোলা জায়গার সীমানায় খোলা ড্রেনের পাশেই কাধঁ সমান দুই পাড়ার মাঝখানের দেয়াল, তার পরেই খেলার মাঠ। মাঠের পাশ দিয়েই শহরের অতি ব্যস্ত রাস্তা। সীমানার দেয়ালে কতগুলি ইট খসিয়ে ড্রেনের উপর একটা মোটা তক্তা ফেলে লোকজন ভাঙ্গাদেয়াল ডিঙ্গিয়ে এ পাড়া থেকে বড় রাস্তায় যাবার নিরিবিলি একটা পায়েচলা পথ করেছে।

আম্মা রাণ্ণা ঘরে, পাড়ার ছোটরা বাড়ীর সামনে দেয়ালের এপাশেই খেলছে, ডিম পাড়া মুরগীর উচ্চকন্ঠের ডাকে কান ঝালাপালা। বাকি হাঁস মুরগী মনের আনন্দে উঠোনে চরে বেরাচ্ছে। আমি ঘরে বসে আছি, ঘরে অন্ততঃ ধুলোর উৎপাত নেই, যদিও গরমের হল্কা আর সাথে বড় বড় মাছির জন্য  ঘামে ভেজা গা ঘিন ঘিন করছে।

আমাদের সেই ছোট শহরে গোলাগুলির শব্দ তখন অচেনা, তাই হটাৎ কান ফাটানো গুলির শব্দে আমি খোলা জানালা দিয়ে দেখি রাস্তার মানুষ ভয়ে চোখের পলকে যে যেদিকে পারলো ছুটেলো, আমাদের দেয়াল ডিঙ্গিয়ে মুহুর্তেই প্রায় জনা পঞ্চাশেক মানুষ গাদাগাদি করে আমাদের ঘরে আশ্রয় নিল। একটানা গুলির শব্দের পর একেবারে নিঝুম, নিস্তব্দ। কাঠের বন্ধ জানালার সামান্য ফাঁক দিয়ে দেখি জন মানব হীন রাস্তায় পরিত্যাক্ত রিক্সা, বেবিট্যাক্সি, ঠেলার পাশে কয়েকটি লাস পড়ে আছে। কর্কশ শব্দে একটা সৈন্য বোঝাই গাড়ি এসে থামলো খেলার মাঠের পাশের রাস্তায়। নিঁখুত ইউনিফর্ম পড়া দশ বারোজন সৈন্য ঝপাঝপ লাফ দিয়ে নামল। সাবলিল,নিপুন দক্ষতায় একটু কুঁজো হয়ে বিদ্যুৎ গতিতে খেলার মাঠটি অতিক্রম করে ভাঙ্গা দেয়াল পার হয়ে তক্তার উপরে একজন, আরেক জন  ঠিক তার পিছনে আমাদের বাড়ী গুলির দিকে মুখ করে দাড়ালো। সতর্ক, আক্রমনাত্বক, নিষ্ঠুর, শিকারী শ্বাপদের মত। মাথায় হ্যাট, কাঁধের এক পাশ দিয়ে আরেক হাতের নীচে মালার মত গুলির বেল্ট, হাতে আগ্নেয় অস্ত্রের মাথায় ধারালো বেয়োনেটের ফলা রোদের আলোয় ঝিক মিকিয়ে ভয়ঙ্কর বিপদ সঙ্কেতের আভাস দিল। জানালার চিলতে ফাঁকে দেখা যাচ্ছে দাঁড়িয়ে থাকা সৈন্যটির পায়ের তক্তার নীচে শুকনো ড্রেনের মধ্য কে যেন আশ্রয় নিয়েছে। অই পলাতক মানুষটার জন্য এক ঘর মানুষ মনে হয় ভয়ে নিশ্বাস নিতেও ভুলে গেছে। ঘরের ভিতরে তাকিয়ে দেখি, রাস্তার চেনা, অচেনা, জানা, অজানা বারো জাতের  ঠাসা ঠাসি করে দাড়ানো মানুষ, দরজা বন্দ, ভরদুপুরেও অন্ধকার ঘরে, নিরব, আতঙ্কে ভুলে গেছে, সময়, কোথায় তাদের গন্তব্য, তাদের আপন জন, এমনকি আমিও জানিনা, ঘরে আমার ভাইবোনেরা কি আসতে পেরেছে, আম্মা কি রান্নাঘরে, আব্বা কোথায়? কে কোথায়? তখন সে চিন্তার অবকাশ বোধ হয় কারো ছিল না। অনেক পরে আমার খুব মনে হয়েছে, আমরা নিজের জীবনকে কত ভালোবাসি, মৃত্যুকে কত ভয় পাই, পার্থিব সব কিছুর উর্ধে আত্বরক্ষার  এই আকুতি, অন্যের জন্য এই মায়াই বোধ হয় জীবন।

সেই জগদ্দল আতঙ্কের স্থায়িত্ব কতক্ষন ছিল মনে নেই, তখন মনে হয়েছে অনন্তকাল। সেই মুর্তিমান বিপদ, দুই পাকিস্তানি সৈন্য দুজন তীক্ষ্ণ দৃস্টিতে আমাদের আপাতঃ নিরব বাড়ী গুলি পর্যবেক্ষন করে দাড়ানোর  ভঙ্গির একটুও শিথিল নাকরে সেই টান টান শরীরে পরিস্কার তিক্ষ্ণ, উচ্চকন্ঠে, কতৃত্বের সাথে বিজাতীয় ভাষায় কি যেন আদেশ দিল। তারপর তক্তার উপর দাঁড়ানো সৈন্যটি আকাশের দিকে ঠা ঠা করে এক রাউন্ড গুলি ছুড়ে প্রভুত্বের কতৃত্ব জাহির করে ক্ষিপ্র, প্রায় শৈল্পিক দক্ষতায় পিছে হটে গিয়ে তাদের গাড়িতে উঠলো, চরাচর কাপিয়ে হটাৎ করেই গাড়ীটা স্থান ত্যাগ করলো। পিছনে পড়ে রইলো কয়েকটি অবহেলিত লাস, পরিত্যাক্ত জনমানবহীন যানবাহন, ফেরিওয়ালার গাট্টি- বোস্কা, ডালা- ঝুরি, স্যান্ডেল, নিশ্তব্ধ আতঙ্কিত জনপদ।

সৈন্যরা চলে যাবার পর যেমন হটাৎ করেই আমাদের ঘরটি ভরে গেছিলো ভয় পাওয়া লোকজনে, ঠিক তেমনিই নিজেরাই দরজা খুলে লোকজন বেড়িয়ে গেল। হতাশ, বিষাদগ্রস্থ, আতঙ্কিত ঘামে ভেজা অসহায় মানুষগুলি সামনে হটাৎ আরোপিত কারফিউ এর অনিশ্চিত, বিপদ সংকুল মৃত্যু উপত্যকা।  জিম্মি হবার সেই নিদারুন আতঙ্কের ছাপ নিয়ে তক্তার নীচের শুকনো ড্রেন থেকে বেড়িয়ে এল আমাদের পাড়ার দুরুন্ত কিশোর বুলু!  ঘিরে দাঁড়ানো কৌতুহলি মানুষজনকে ঢোক গিলে শুকনো গলায় সে বললো ‘ আল্লার কিড়ে, আজরাইল ফেরেস্তারে আমি নিজের চক্ষে দ্যাখলাম, হায়াত ছেলো, তাই আইজকে জানে বাইচে গেলাম।

 

About admin

Check Also

give1-300x76

ইমিগ্রান্ট কড়চা (CBET), আসমা খান Immigrant Diary (CBET), Asma Khan

ইমিগ্রান্ট কড়চা (CBET), আসমা খান Immigrant Diary (CBET), Asma Khan স্কুলে আমাদের পন্ডিত স্যার বাংলা …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *