Home / Articles / Immigrant Diary ( Part 1, new Immigrant), Asma Khan; ইমিগ্রান্ট’ কড়চা (প্রথম পর্ব, new immigrant) আসমা খান

Immigrant Diary ( Part 1, new Immigrant), Asma Khan; ইমিগ্রান্ট’ কড়চা (প্রথম পর্ব, new immigrant) আসমা খান

 Immigrant Diary ( Part 1), Asma Khan; ইমিগ্রান্ট’ কড়চা (প্রথম পর্ব) আসমা খান

সপ্তাহে দশ ঘন্টার লেকচার, বছরের নয় মাস চাকরি করে তের মাসের  ট্যাক্স ফ্রি বেতন, মুফতে চমৎকার ফার্নিচার সহ বিশাল থাকার বাসাবাড়ি, দুই মাসের ছুটি সহ ম্যাঞ্চেস্টারে  যাবার প্লেনের ফ্রি টিকেট, পানির দরে বাজার সদাই প্রায় মাগনা পেট্রল, এমনকি বাহরায়েনে রাতের খাবার খেয়ে প্লেনে গিয়ে ঘুম দিলে সকালে দিব্যি বাংলাদেশে গিয়ে আত্বীয় স্বজনদের সাথে ঝিরি ঝিরি আলুভাজি, ডিম, সুজির হালুয়া দিয়ে গরম গরম পরাটা আর মসলা চায়ে চুমুক দেয়া যায়। সেই আরাম ছেড়ে স্রেফ মেয়েদের পড়াশোনার জন্য কানাডাতে ফের নুতন করে জীবন একেবারে গোড়া শুরু করা  আমার স্বামির কাছে এক মহা আজগুবি ব্যাপার মনে হয়েছে। বহুত দেন-দরবার করে, এমনকি নিজের সাথেও অনেক বোঝাপড়া করে জন প্রতি দুটো স্যুটকেস আর মনের মধ্য মায়াময় বাসিন্দাসহ এক স্মৃতিঘর নিয়ে অন্যান্য পূবের মানুষের মত কানাডাতে হিজরত করি। মোহাজের হয়ে প্রথমে উপলব্ধি, যেখানে এলাম সেখানে ভু-প্রকৃতি, বাসা বাড়ি, গাছপালা তো ভিন্ন বটেই, মানুষজনও ভিন্ন ধর্মের, ভিন্ন বর্ণের, ভিন্ন ভাষার। এই এত সব ‘ভিন্ন’তায়  নিজকেই চেনা আর চেনানো চাট্টিখানি কথা নয়।

গাঁও-গ্রাম থেকে মানুষ জন গঞ্জে এসে যেমন প্রথমে খুঁজে বের করে জানাশোনা গ্রামের তুতে ভাইদের, আমরাও তেমনি এক বন্ধুকে যোগাযোগ করে একটা বাসা ভাড়া করে দিতে অনুরোধ করি। পরবাসে বসবাস তো সেই দুই দশক ধরেই; ঠিকানা বদল কোন অপরিচিত নয়, পর্যটক হিসেবে পশ্চিমে এসেছি কত বার, কিন্তু এবারের দ্বিধা স্বেচ্ছায় পরিচয় বদল। নুতন করে জীবন গড়া, আর কোন যাদুতে ভিন্ন বিদেশ আপন স্বদেশ  হয়। পরিচয় বদল মানে  পাসপোর্টতো বটেই, বাংলাদেশের পাসপোর্ট নিয়ে যেকোন দেশের আর বিশেষ করে হিথ্রোতে যে পরিস্থিতির উদ্ভব হয় সেটা আর না বলি। আর আসলে পরিচয় (Identity) মানে আমরা নিজে কি সেটা জানা, অন্যদেরকে সেটা জানানো, আর অন্যরা আমাদের সমন্ধে কি জানছে ও ভাবছে। সমাজে বসত করা, জিগ’স পাজলের মত খাপে খাপে বসে যাওয়া।

বাড়িতে ছোট্ট সোনামনি থাকলে সবচেয়ে মজার সময় হচ্ছে যখন সে বড়দের প্রশ্নের উত্তরে নিজের চোখ, নাক, কান, হাত, পা, মায় জামা তুলে নিজের পেটটাও দেখিয়ে দুধ-দাতে যে মধুর হাসিটা দেয়, সেখান থেকে আইডেন্টিটির প্রথম পর্বের শুরু। আর একটু বড় হলে কচি কন্ঠে বলে আমার নাম আনিসুর রাহমান, বাবার নাম সাইফুর রাহমান, দাদার নাম হাসিবুর রাহমান (পরবাসে নুতন প্রজন্ম কি জানে নানা দাদার নাম? আমার নাতনী অবশ্য নিজের নামের দ্বিতীয় অংশে নানীর নাম যোগ করেছে!) । কয় ভাই বোন সেটাও বলতে পারবে। ক্রমশঃ নিজেই বুঝতে পারবে তার নাম কেন আনিসা নয়, বা অনিল বা এডাম নয়। কোন পাড়ায় বাসা, কোন স্কুলে কোন শ্রেণীতে পড়ে সেটাও বলতে পারবে, আর আমাদের দেশে পরিবারে পুত্রধনের আদর সোহাগের কথায় আর না গেলাম।
পরিবারের ধর্মীয় বিশ্বাস হচ্ছে তাদের সামাজিক আচরনের অবয়ব। যেমন মুসলমানদের নামাজে পড়া, সালাম দেয়া, রোজা রাখা। তাই সামাজিক দিন যাপনে, উৎসবে আনুষ্ঠানিকতা খাওয়া, দাওয়া, পোষাক আশাক, প্রার্থনা, ঐতিহ্যর ধারাবাহিকতা রক্ষা করে বংশ পরস্পরা।

কথ্য ভাষায় অঞ্চল ভিত্তিক পার্থক্যতো আছেই। যেটা দেশে থেকে অত বোঝা যায় না, দেশের বাইরে গেলে অনেকে হৃদয়ঙ্গম করে। এ প্রসঙ্গে এক মজা্র গল্প মনে এল। মধ্যপ্রাচ্যর প্রত্যন্ত মরুপ্রান্তে এক বাংলাদেশি সিলেটি ভারতীয়দের সাথে শ্রমিক হিসেবে কাজে যোগ দিল। দিন যায়, ভিন দেশিদের সাথে থেকে থেকে দেশের জন্য মনটা আকুল যখন, হঠাৎ তখন ভাগ্যক্রমে কাছের শহরে আসার সুযোগ হোল। বাস থেকে নেমে দেখা হোল এক চাঁটগার দেশি-ভাই এর  সাথে, সেও এসেছে অন্য এক পাকিস্তানি শ্রমিক ক্যাম্প থেকে। আবেগে জড়িয়ে ধরে দুজনে অনর্গল সিলেটি আর চাঁটগাইয়া বাংলা কথা বলছে, কিন্তু কেউ কারো কথা বুঝতে পারছে না। অবশেষে উপায়হীন একজন অন্য জনকে জিজ্ঞেস করে ‘আপকো হিন্দি মালুম হ্যায়?’

ছিয়ানব্বই সালে অটোয়া ছিলো সিলিকন ভ্যালী নর্থ, হাইটেকের বেলুন সবে আকাশ মুখি, আমার স্বামী অটোয়া আসার এক মাসের মাথায় মধ্যপ্রাচ্যর এসোসিয়েট প্রফেসরের থেকে ঢের বেশী বেতনে হাইটেকে সিস্টেম ইঞ্জিনীয়ার হিসেবে চাকরিতে যোগ দিলেন। এখানে এসে চাকরীর সাথে সাথে তিনি সমাজ কল্যাণ মুলক কাজ যেমন হাইস্কুলগামী ইমিগ্রান্ট বাচ্চাদের অংক এবং বিজ্ঞানের বিষয় গুলির টিউটরিং শুরু করলেন বিভিন্ন কমিউনিটি সেন্টার ভাড়া করে। আমার মেয়েরা স্কলারশিপ নিয়ে ভার্সিটি আর ছেলে স্কুলে। তাদের জন্ম, বেড়ে ওঠা বাংলাদেশের বাইরে, এমনিতেও তাদের মনের মাঝে ফুল ফল সমেত স্মৃতি গাছ নেই যার শিকড় বাংলাদেশে প্রথিত। কিন্তু বাবা মায়ের স্মৃতি ঘরের বাসিন্দাদের গল্প  তাদের বড়ই মায়াময় লাগে, মনের টানে পুর্ব পুরুষদের ঐতিহ্য মনে এক ধরনের বিলংগিং এর বোধ দেয়, নির্ভরতা দেয়। শুধুই বাংগালী ইমিগ্রান্টের সন্তান হিসেবে তাদের বরং পিছুটান না থাকায় সহজেই ‘ইঞ্জিনীয়ারস উইদাউট বর্ডার’ বা যেকোন ব্রান্ড নেমের চ্যারিটি বা যেকোন কানাডিয়ান কল্যান মুলক কাজে, খেলাধুলায় সময় দিতে দ্বিধা হয়নি মোটেও, পড়াশোনার ফাঁকে ফাঁকে। ইঞ্জিনীয়ার হিসেবে চাকরীর নিয়োগ পত্র পকেটস্থ করেছে তারা ভার্সিটির শেষ পরীক্ষা দেয়ার ঢের আগে। ইতিমধ্যে হোল কি, কানাডার ইমিগ্রেশন ‘ল এর কিছু ছাড় পেয়ে দলে দলে সপরিবারে পুবের মানুষ অটোয়াতে এলো। ধুম ধাম জঙ্গল কেটে বাড়ী ঘর, রাস্তাঘাট, আলো ঝলমল শপিং মল তৈরির হিড়িক পরে গেল। ইমিগ্রান্টরা এসে একদম আনকোরা নুতন চমৎকার বাসা কিনে বসবাস শুরু করলো। অটোয়ার নাগরিক নকশী কাথাঁয় বাংলাদেশিরা নিজেদের স্বাক্ষর রাখলো।

পশ্চিমের দেশ গুলির মত কানাডা উন্নত জীবন ব্যাবস্থা করেছে, মানুষের নাগরিক মত প্রকাশের স্বাধীনতা, তাদের ধর্মিয় বা ঐতিহ্য, উৎসব পালনের স্বাধীনতা নিশ্চিত করেছে। নিশ্চিত করেছে নিম্নতম মজুরি, যোগ্যতার ও সন্মানের যথাযথ মুল্যায়ন। মোহাজের হিসেবে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক পূবের মানুষ  নিজ দেশের উচ্চতর ডিগ্রি থাকা সত্বেও এদেশে আবার লেখাপড়া করে সন্মান জনক চাকরি করে দ্বিতীয় প্রজন্মের জন্য সামাজিক পরিচয় সহজ করেছে।  পুবের সামাজিক ব্যবস্থায় প্রান্তিক নারী চরিত্র পশ্চিমে এসে প্রথমে শ্রমবাজারে আয় রোজগার করে সংসার চালিয়েছে, আর পুরুষরা পড়াশোনায় নিজেদের শিক্ষিত করেছে চাকরির প্রতিযোগিতায় যোগ্য প্রার্থি হিশেবে। পরিবারে মেয়েদের এই স্থান বদল হেঁসেল সামলানো থেকে রুজি-রোজগারে সংসার চালানো, নিজেদের একান্ত শখ মিটাতে অন্য কারো মুখাপেক্ষি না হওয়াটা মহিলাদের এক রকম মুক্তির আনন্দ দিয়েছে।

এ প্রসঙ্গে একটি ঘটনা মনে পড়লো। প্রায় প্রতি বছরই দেশে বেড়াতে যাচ্ছি শুনে সারাদিন ঘরে বসে থাকা এক ভাবী আফশোস করেন কত বছর উনি দেশে যেতে পারছেন না, অর্থনৈতিক কারনে। আমি উনাকে বলেছিলাম চব্বিশ ঘন্টা খোলা থাকে  বাসার কাছের ম্যাকডোনাল্ড বা টিম হর্টনের যে কোন আট ঘন্টার শিফটে সপ্তাহে পাঁচ দিন, তিন মাস কাজ করলেই দেশে যাবার টিকেটের টাকা, এমনকি দেশে আপন জনের জন্য উপহারের টাকাও কামাই করে দেশ যাওয়া যায়। তারপর বহুদিন দেখা হয়নি উনার সাথে, এক ঈদ-মিলন অনুষ্ঠানে উনি এসে আমাকে জানালেন, আমার কথা মনে করেন খুব, সেই থেকে টিম-হর্টনে কাজ করছেন, আর হিসেব করেন কত তিন মাস পার হোল,কত বার উনি দেশে যেতে পারতেন, কিন্তু না গিয়ে বাড়ি কিনেছেন, নিজ বাড়িতে থাকছেন সপরিবারে। সপ্তাহান্তে দাওয়াত দিচ্ছেন, বা খাচ্ছেন। ঘর সাজাচ্ছেন মনের মত, আফসোস নেই।

ক্রমশ…

About admin

Check Also

give1-300x76

ইমিগ্রান্ট কড়চা (CBET), আসমা খান Immigrant Diary (CBET), Asma Khan

ইমিগ্রান্ট কড়চা (CBET), আসমা খান Immigrant Diary (CBET), Asma Khan স্কুলে আমাদের পন্ডিত স্যার বাংলা …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *