Home / Articles / December Asma Khan; ডিসেম্বর, আসমা খান

December Asma Khan; ডিসেম্বর, আসমা খান

December Asma Khan; ডিসেম্বর, আসমা খান

গত বছর (’১৩ সালে) বাংলাদেশে গণ্ডগোল বেঁধে গেল। অটোয়াতে আমরা আগেই দেশে যাবার টিকিট কেটে ফেলেছি, দুইবার ভালো রকম অর্থ দন্ডি দিয়ে যাত্রা পিছোলাম। পুরো টাকা জলে যাবে বিধায় সাহস করেই অবশেষে গন্ডগোল জেনেও ডিসেম্বরে প্লেনে উঠলাম। যাত্রার শেষ পর্বে কুয়েত ত্থেকে ঢাকা, ঢাউশ এই প্লেনে সাকুল্লে জনা পঞ্চাশেক যাত্রি,  ভ্রমন ক্লান্তির চাইতে দেশের পরিস্থিতির দুশ্চিন্তা একদম লেপ্টে আছে সব্বার চোখে মুখে। ভরদুপুরে ঢাকা এয়ারপোর্টে নেমে এত ভয় পেলাম যে বলার নয়। জন মানবহীন ভুতুড়ে শহর খাঁ খাঁ করছে। এক লক্কড় ঝক্কর ট্যাক্সি করে বাইশ মিনিটে বসুন্ধরার নির্জন ফ্লাটে চলে এলাম। ভাগ্নে তার সেল ফোন আর টিফিন কেরিয়ারে খাবার দিয়ে গেল, বলে গেল সারা দেশে অবরোধ চলছে, স্কুল কলেজ অফিস আদালত রাস্তা ঘাট সব বন্ধ, নামাজও ঘরে পড়তে, বিনা প্রয়োজনে ঘর থেকে বের না হতে।
পরেরদিন সকালে ফাঁকা রাস্তায় দেখি  দুই চার জন হেঁটে যাচ্ছে, দেখাদেখি আমরাও বের হলাম, হাটা পথেই কাঁচা বাজার। সবে দোকান সাজাচ্ছে ভয়ার্ত কিছু লোকজনকে দেখে ভরসা পেলাম। ঠিক তক্ষুনি রিক্সা থেকে খুব সামান্য  নূতন মাছের চালান নামল, এক আঙ্গুল সমান ছোট ট্যাংরা(বজুরি) মাছ ঝুড়ির মধ্য ক্লান্তিহীন ভাবে নেচে চলেছে, আহা, দেখে কি যে ভালো লাগল। আমার বুড়ো জিজ্ঞেস করে ‘কিনি?’

পনের ষোল বছরের এক ছেলে বসা দোকানে। আমি তাকে জিজ্ঞেস করি ‘বাবা মাছ গুলি কুটে দেয়া যাবে?’ তো ছেলেটা হেসে আমাকে বলে ‘খালা এট্টু খাড়ান, এইহানে এট্টা গ্যাসের চুলা বহাই, মাছগুলি কুইট্টা, ধুইয়া, রাইন্ধ্যা দেই?’ খুব হতাশ স্বরে তারপর বলে  ‘ও খালা, বাজারের অবস্থা দেখছেন? মাল সামান লূকজন কই? গুরা মাছ কুইট্টা বেচলে আমগো পোষায়ইবো?’  সত্যি বড় অবাক ব্যাপার, রাস্তা ফক ফক্কা ফাঁকা, যাও দুই চার জন পথচারী,তাদের চোখে মুখে অব্যাক্ত অসহায় ভয় সেই ৭১ এর যুদ্ধের সময়ের মত। দেশের মানুষ জিম্মি, শামুকের মত ঘর বন্দি। আমরা তো শীতের অতিথী পাখীর মত, আফশোস শুধু মুরুব্বিদের সাথে দেখা সাক্ষাৎ, মরহুম বাবা, মা, শ্বশুরের কবরটাও জিয়ারত করতে পারলাম না। ফাঁক ফোঁকরে ভাই বোনেরা এসে দেখা করেছে।
১৬ই ডিসেম্বর ’৭১ সালের এইদিন বাংলাদেশের ইতিহাসে সোনার অক্ষরে লেখা। আমাদের স্মৃতিতেও। আমাদের স্বল্পভাষি আব্বার অনুভুতির প্রকাশ আমরা দেখিনি খুব একটা, ঐ ‘৭১এর যুদ্ধের ভয়াল দিন গুলি ছাড়া। এমনিতে আব্বা বেখেয়াল, সংসার উদাসিন, গাজ্জালী বা খৈয়ামের বই আর এক বাক্স খয়ের জর্দা দিয়ে বানানো পান পেলে উনি আর চেনা জগতে থাকতেন না। সপরিবারে জিম্মি, অবরুদ্ধ, হয়ে অনিশ্চয়তা, অসহায়তায় সন্তানের জন্য আকুল হওয়া পিতার এমন মানবিক অনুভুতির গল্পগাছি নাহয় আরেক দিন হবে। নভেম্বরের মাঝামাঝি যুদ্ধ যখন তুঙ্গে, আব্বা আমাদের সব্বাইকে নিয়ে অনেক জিল্লতি পুহিয়ে উঠোনে বড় করে ট্রেন্স খুড়লেন। আমরা আদর করে নাম দিয়েছিলাম মাটির ঘর, যদিও ‘কবর’ হবার শংকা মনে বিঁধে থাকত। জিন্দেগিতে আব্বা আমাদের পড়াশোনার খোজ নেননি, সেই সময় আমাদের প্রত্যক ভাইবোনকে সুরা তওবার শেষ আয়াত, আয়তুল কুরসি, চার কুল শিখিয়েছেন, পড়িয়েছেন।  মসজিদের ইমাম সাহেব নাকি বলেছেন এই আয়াত গুলি সকালে পড়লে তাঁর ঐ দিন অপঘাতে মৃত্যু হবেনা।

বিজয় দিবসের দিন ভোর থেকে কান ফাটানো তুমুল গুলিবৃস্টি, সাইরেন শুনে আমরা মাটির ঘরে ঠাসাঠাসি করে আশ্রয় নিলাম, যুদ্ধের মরন কামড়, মনে হয় সকাল সাড়ে নয়টার গোলাগুলির হুংকার হঠাৎ থেমে গেল, ক্লিয়ার সাইরেন শুনে আমরা ঘরে ফিরলাম। এক নিরব, নিথর, বন্ধ্যা, থিতোনো, অবসন্ন মুহুর্ত। ঘরে এসে কাঁধের যোয়াল খোলা ভারবাহী পরিশ্রান্ত জানোয়ারের মত যে যেখানে পারলো, ধুপ ধাপ চেয়ারে, খাটে ঝিম ধরা হাত পায়ের খিল খুলতে শুয়ে বসে। অনেক দূর থেকে অস্পস্ট কিন্তু খুব কাঙ্ক্ষিত এক ধ্বনি কানে এল, সকলের অভুক্ত নিস্প্রভ চোখে আলো জ্বলে উঠল, কান খাড়া করে, ছিলা ছেড়া ধনুকের মত শরীর মন টান করে, গভীর মনোযোগে সব্বাই উৎকর্ন হয়ে এবার পরিস্কার শুনতে পারলো ‘জ…য়    বাং …লা… আ… আ’। কত কত দিন ধরে বন্ধ ঘর বাড়ির জানালা দরজা গুলি ফটাফট খুলে গেল, মুহুর্তে এতদিন ধরে জিম্মি, অধীন লোকজন চোখের পলকে ঘর থেকে বেড়িয়ে রাস্তায় এসে দেখে মাথার উপর আগ্নেয়াস্ত্র তুলে ধুলো মাখা খালি পায়ে তীর বেগে ছুটে আসছে কতিপয় বীর তরুন মুক্তিযোদ্ধা! আবাল বৃদ্ধ বনিতা ঘর ছেড়ে রাস্তায় নামলো ‘জয় বাংলা’ স্লোগান গর্জনের মত ছড়িয়ে গেল দূর দুরান্তে। ঘরবন্দি মানুষগুলি হঠাৎ যেন বাধঁ ভাঙ্গা জলপ্রপাত!! বিজয়ের বিপুল আবেগ, মুক্তির আনন্দে পর্বত শৃঙ্গ থেকে পাদদেশে পড়েই আবার উচ্ছলিত আনন্দে ফের ফোয়ারার মত নেচে দিগন্তে মিহি জলীয় বাস্প ছড়িয়ে দিল রংধনুর জন্য!!! ১৬ ই  ডিসেম্বর ‘৭১ শুধুই যুদ্ধ জয়, ভুমি জয় নয়, ঐদিন ছিল বাংলাদেশের মানুষের স্বপ্ন জয়ের দিন!

১৮ই ডিসেম্বর ২০১৪সাল। কানাডার রাজধানী অটোয়ার একটি গুরুত্বপুর্ন সড়ক  3020 Woodroffe Ave তে আজ SNMC Center and Masjid এর নিজস্ব  বিশাল নান্দনিক স্থাপনা্র দরজা খোলা হোল। ধর্মিয় উপাসনা ও সামাজিক মিলন এর  আধেয় হলেও স্থাপত্য শৈলীতে ও মুল্যবোধে পুব এবং পশ্চিমের এ যেন যুগলবন্ধি প্রকাশ।  হীম শীতল বৈরী আবহাওয়া, তুষারপাত উপেক্ষা করে ‘শয়ে ‘শয়ে ইমিগ্রান্ট মুসলমান সানন্দে এসেছে পরম শ্রদ্ধাভরে ‘সিজদা’  করার জন্য। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের, ভাষার, গোত্রের, বর্ণের মানুষ নিজ নিজ দেশে ভয়, অনিশ্চয়তা, যুদ্ধ, স্বৈরাচার, গুপ্তহত্যা, ক্ষমতার দাপট, পরপ্সপরে হানাহানি, দুর্নীতি, দারিদ্র আর ধর্মের চুলচেরা রিচুয়াল আর ফতোয়া যাদের নিত্যসঙ্গী ছিল। স্বেচ্ছায় বা নিরুপায় নির্বাসনে এদেশে নুতন করে জীবন শুরু করায় খন্ডিত স্বত্বায় যে ক্ষরন, পীড়ন ছিল, এই সেন্টার ও মসজিদে এসে অতীত জীবনের শত্রু/মিত্র দেশের, ভিন্ন জাতের, ভিন্ন ভাষার মানুষের সাথে এক কাতারে দাঁড়িয়ে উপলব্ধি করলো আধ্যাতিকতার সাথে সম্পর্কিত সামাজিক সহনশীলতা, ভাতৃত্ববোধের ধর্মিয় সংজ্ঞায় জীবন অনেক পুর্নাংগ ও তাৎপর্যময়। ক্যানাডার পাঁচমিশেলি সমাজে আত্বপরিচয় নিরন্তর অনুভবের ব্যাপার, অধিকার ও দায়িত্বের সংমিশ্র্নে হয় আত্বপ্রকাশ ও আত্ববিকাশ।
এই ডিসেম্বরের সাথে সাথে ’১৪ সাল শেষ হয়ে যাচ্ছে। ’১৫ সালকে স্বাগত জানাই, সকলের জন্য সুস্বাস্থ্য, শান্তি ও সমৃদ্ধি কামনা করি। শুভ নববর্ষ!!!

About admin

Check Also

give1-300x76

ইমিগ্রান্ট কড়চা (CBET), আসমা খান Immigrant Diary (CBET), Asma Khan

ইমিগ্রান্ট কড়চা (CBET), আসমা খান Immigrant Diary (CBET), Asma Khan স্কুলে আমাদের পন্ডিত স্যার বাংলা …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *