Home / Articles / Immigrant Diary (O My Country Soil), Asma Khan, ইমিগ্রান্ট ডাইরি (ও আমার দেশের মাটি…), আসমা খান

Immigrant Diary (O My Country Soil), Asma Khan, ইমিগ্রান্ট ডাইরি (ও আমার দেশের মাটি…), আসমা খান

Immigrant Diary (O My Country Soil), Asma Khan, 

ইমিগ্রান্ট ডাইরি (ও আমার দেশের মাটি…), আসমা খান

কেন যেন শীত এলেই বাংলাদেশে যেতে ইচ্ছে করে খুব। গত ’১৪ সালে যেতে পারিনি, ’১৫ তে খুব সাহস করে ডিসেম্বরের দুই তারিখে আধাবেলা হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়ে তিন তারিখে রওনা দিলাম। অটোয়া, মন্ট্রিয়েল, হিথ্রো, কুয়েত হয়ে ঢাকা। প্যারিস ঘটনার পর এয়ারপোর্ট গুলোতে জোর নিরাপত্ত্বার বজ্র আটুনির কঠিন গেঁড়ো। আমার আবার প্লাস্টিকের হাটু! এয়ারপোর্টের নিরাপত্ত্বা দরজায় ঢুকলেই আলো জ্বলে, বাজনা বাজে, আশপাশের লোকজন চোখ গোল্লা গোল্লা করে তাকিয়ে দেখে ব্যাপারখানা!  তো আমি আগেভাগেই গোমরামুখো নিরাপত্ত্বা কর্মীদের বলে দেই আমার হাঁটুর কথা, তাঁরা কিঞ্চিত সহজ ভাবে মেশিন টেশিন নিয়ে কম ঝামেলায় পরীক্ষা করে এবার ছাড় দিয়েছে সবত্র। না, জুতো খোলায়নি।

ঢাকাতেও Airbnbর মত শেয়ারড বা ফার্নিস এপার্টম্যান্ট ভাড়া (স্বল্প সময়ের জন্য) পাওয়া যায়, বসুন্ধরাতে আমাদের ভাড়া করা সেই ফার্নিস এপার্টমেন্টে পৌছলাম পাঁচ তারিখের দুপুরে। দুইদিনের লম্বা যাত্রার শেষে ধাতস্ত হতে সময় লাগে বৈকি। যেটা আমাকে অবাক করলো বাংলাদেশে ইদানিং ভিন দেশের নাগরিকত্ব থাকা যেন কৌলীন্যর পরিচয়। আমাদের সেই ভাড়া বাড়ির মালিক পৌঢ়ত্বে পৌছে তাঁর বিশাল সাত তালা বাড়ির (চারটা ফ্লাট প্রতি ফ্লোরে) সদ্য কানাডা চলে গিয়েছেন ইমিগ্রেশন নিয়ে। তিনি যেটায় থাকতেন সেই ফ্লাটে আমরা উঠলাম সেটায় কি চমৎকার কাঠের আসবাবপত্র!! রান্নাঘরটা কি সুন্দর। দেয়ালে দেয়ালে এখনো তাঁদের স্মৃতিময় সব পারিবারিক ফটো সাজানো… আমাকে পরিচিত একজন দেখতে এসে সব দেখে টেখে বলে ‘শোন সুখে থাকলে ভূতে কিলোয় আর নাহলে এই সাজানো ঘর দুয়ার ছেড়ে এই বয়সে কেউ বৈদেশি হয়?’ আমি তাঁকে আলগোছে খোঁচাই ‘আঙ্গুর ফল টক?’ খুব দৃঢ়তার সাথে তিনি বললেন ‘না, একটু চোখ কান খুলে দেখ দেশ অনেক বদলেছে, বিদেশের থেকে জৌলুস খুব কম না, মানুষ বিলাসী পণ্য চায়, এই দরজা দিয়ে সোজা পাঁচ মিনিটে হেঁটেই যেতে পারবি ‘যমুনা ফিউচার পার্কে’। দেশি বিদেশি সব ব্রান্ডনেমের দোকান, স্বনামেই বিদেশী বনিক বানিজ্য করছে (?)

হাইওয়ে থেকে বসুন্ধরা ঢোকার মুখেই আলো ঝল মল কনভেনশন সেন্টার, আগা খান এডুকেশন সেন্টার, য়্যপোলো হাসপাতাল, বিরাট বিশাল দালা্নকোঠা, দোকানপাট, কত যে রেস্টুরেন্ট, ঝা চকচকে গাড়ি বহর ঢাকা আমার কাছে বড় জৌলুসের, বড় মোহনীয় কিন্তু আমার সেই চেনা স্মৃতির শহরকে বড়ই অচেনা লাগে। কেন যেন মনে হয় সেই গাছপালা ভরা, ছোট ছোট বাড়ি, রিকসা ওয়ালার টুং টাং, সাদাসিধে বড় আপন করে নেয়া সেই সব মানুষজন যেন হপিস হয়ে গেছে।

বিশ্বের মানচিত্রে প্রায় মহাদেশের সমান আয়তনের দেশ কানাডার প্রায় সমান জনসংখ্যা ছোট্ট আয়তনের মহানগর ঢাকার জনসংখ্যা। পরম নিন্দুকও বলতে বাধ্য হবে ঢাকার ব্যাপক উন্নয়নের কথা, ইন্টারনেট প্রযুক্তি,(আমজনতা, এমনকি কাজের বুয়ারাও ফো্ন, ফেসবুকে অভ্যস্ত) টেলভিশন, বাড়িঘর, ফ্লাইওভার, চাষাবাদ, বিভিন্ন ইন্ডাস্ট্রি, ছোট বড় ব্যাবসা ঢাকাকে অতি আধুনিক এক মহানগরে রূপান্তরিত করেছে। কিন্তু আধুনিক শহর নগরের প্রতীক চলাচলে দ্রুতগতি, সেই গতিময়তায় ঢাকা একেবারেই করুনদশা। সারাদিন ঢাকা ঝিম মেরে বসে থাকে ট্রাফিক জ্যামে। আমরা যেখানেই দাওয়াতে গিয়েছি, বা আত্বীয় বন্ধু এসেছে দেখা করতে, মোটামুটি ঘন্টা পাঁচেক রাস্তায় বসা।
আমার মনে হয়েছে ঢাকায় যদি পশ্চিমের মত মিনিট পর পর কার্যকর ডাবল ডেকার বাস সার্ভিস, আলাদা বাস-লেন, পিক
আওয়ারে এক্সপ্রেস বাস, মান্থলি বাস-পাস চালু করা যায়, তবু মানুষ কি ঘন্টার পর ঘন্টা রাস্তায় অভিজাত গাড়ি কয়েদী হবে কৌলিন্য বজায় রাখার জন্য?

আমি, আমার তিন মেয়ে, উপরি ছোট্ট নাতনী মোট পাঁচ জনের বছরের দুই ঈদের জন্য পাঁচ দু গুনে দশ সেট ঈদের কাপর, আমার ঘরে পড়ার এবং দাওয়াত রক্ষা করার জন্য আরো কয়েক সেট, সেগুলি কেনা, সেলাই করা, সে এক মহা ঝক্কির কাজ। আমার স্বামি আবার সাদাসিধে জীবনযাপন, উন্নত চিন্তাভাবনার অন্য জগতের বাসিন্দা। ঢাকায় অন্যর মুখোপেক্ষি হতে হয় পদে পদে, দোকান চেনা, দর দাম, আর ট্রাফিক জ্যাম!! তো আমি আমার মত করে সমস্যার সমাধান করি। অটোয়ায় আলমারিতে ভাজে ভাজে গড়াগড়ি খাওয়া হাতে গোনা কয়েক বার ব্যাবহার করা প্রায় নুতন শাড়ি থেকে বেছে বেছে গোটা পনের জর্জেট, সিল্ক, এবং কাজকরা শাড়ি স্যুটকেসে গুছিয়ে নিলাম। ঢাকায় এসেই পরিচিত দর্জি শিউলিকে খবর পাঠালাম।

 টেকসই করার জন্য সুতি লাইনিং কামিজের সমান ঝুল(সেমিজের মত দুই ইঞ্চি ছোট নয়) দিয়ে পাইপিং, আঁচল এবং পাঁড় থেকে সামনে বা পিছনে বা হাতায় কাজ বসিয়ে রীতিমত ডিজাইনার বনে গেলাম! আর শিউলিরও যেন সেলাইএর নেশা ধরে গেল, সে গাওসিয়া গিয়ে ম্যাচিং সালোওয়ার, বা ওড়নার কাপর, লাইনিং এর কাপর কিনে এনে সেলাই করে আমার বাসায় এসে যাতায়াত খরচ, কাপড়ের দাম, সেলাই এর মুজুরি বুঝে নিয়ে ফের নুতন অর্ডার ডিজাইন বুঝে নিয়ে গেছে প্রতি দুই তিন দিন পর পর। মেয়েদের জন্য যমুনা এবং পিংক সিটি থেকে সালোওয়ার কামিজের সেট কিনেছি, তারপর প্রবল জ্বর কাশি, মোটা মুটি শয্যাসায়ী।

 বিকেলে বেড়াতে এলেন পরিচিত বৌদি আর ভাবী, কথায় কথায় যখন শুনলেন ঘরে বসেই আমার দুই সপ্তাহে প্রায় দুই স্যুটকেস কাপড় সেলাই হয়ে গেছে, বৌদি চোখ কপালে তুলে বললেন ‘জানেন দুই সেট কাপড় সেলাই করতে দর্জিরা কত ঘোরায়? আমি উত্তরে বলি যদি তাদের ডিজাইনার হবার পথটাকে দেখিয়ে দিতে পারেন, মোট্টেও ঘোরাবেনা’। উনারা যখন কাশ্মীরি বা লখণৌ স্টিচ, চুমকি, বা কাজ করা শাড়ি দিয়ে বা রাজশাহী অথবা ইন্ডিয়ান সিল্ক দিয়ে বানানো সেটগুলি দেখলেন, মুগ্ধ বিস্ময়ে বললেন ‘এ তো ভালো বুদ্ধি, শাড়ি গুলিতো পড়েই আছে’। ঢাকার রাস্তঘাটে শাড়ি পড়া মহিলা চোখে পড়েছে খুবই কম, (শাড়ি এখন মনে হয় পার্টি ড্রেস, মহিলারা দেখি ঘরে ম্যাক্সি বা সালোয়ার কামিজই পড়েন) ফ্যাসানের সালোয়ার কামিজে ঢাকা একেবারে সয়লাব, এটা এখন শুধু তরুণীদের পোষাক নয়, বয়স্করাও ধুমসে পড়ছে। এমনিতেও গার্মেন্টস ইন্ডাস্ট্রির জন্য দেশে এখন হাল ফ্যাসনের কাপর জম জমাট ।

দেখতে দেখতে অটোয়া ফেরার সময় হয়ে গেল। যতদিন বাবা মা বেঁচে ছিলেন, ঢাকা যাবার বা ফেরার আগে বাড়ি মাথায় করে রাখতেন, তাঁরা সেই না ফেরার দেশে চলে গেলে ক্রমশঃ যেটা হয়… চোখের আড়াল হলে মনের আড়াল, সেই চিঠি টেলিগ্রামের দিনও উধাও এখন ড্রাইভারসহ গাড়ি পাঠিয়ে দায়িত্ব পালন, ফ্লাইট ডিলে হলে ড্রাইভারকেই সসংকোচে জানানো হয় ফোনে। ফেরার পথে দেখি প্রতিটি এয়ারপোর্ট যেন কঠিন নিরাপত্তা রক্ষীদের দখলে। ঘন্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা প্লেনে ওঠা নামার আগে পরে। শিকড়কাটা ইমিগ্রান্ট, পাসপোর্টেই নাম ধাম পরিচয়, এইযে স্মৃতির সাম্রাজ্যসহ এক জীবনের দায় নিয়ে এক মহাদেশ থেকে আর এক মহাদেশে এসে থিতু হওয়া। এটা কেমন? ছেলে বেলায় এক বাড়ি গিয়ে বড় অবাক হয়েছিলাম একই গাছে দুই ধরনের বড়ই, এক ডালে ছিল গোল ছোট ছোট টক মিস্টি কিন্তু দারুন মজার বড়ই, আরেক ডালে ছিল বড় বড় নারকেলি মিস্টি কুল। ইমিগ্রান্টরা হচ্ছে ঐ কলমর (graft) বড়ই গাছ!!

 তুষার ঝড়ের মধ্যে অবশেষে অটোয়া এসে পৌছলাম। এই দূর্যোগ মাথায় করে গভীররাতে এয়ারপোর্টে আমাদের আনতে গেছেন পরম সুহৃদ আবু ভাই। দিয়ে গেলেন রান্নাকরা ভাত তরকারী, দুধ, ডিম, কলা, পায়রুটি, আর পচিঁশে ডিসেম্বরে CBETর হয়ে যাওয়া পিঠা উৎসবের থেকে সব রকমের পিঠার স্যাম্পল! উরিব্বাস!!! ইন্টারনেটে যেসব পিঠের ছবি দেখেছি, সেগুলি আমার অটোয়ার বোন ভাবীরা নিজ হাতে বানিয়েছে??? মুহুর্তেই আমার অসুস্থতা, বিষন্নতা, ভ্রমন ক্লান্তি মিলিয়ে গেল সেখানে এক উপাচানো আনন্দে মন ভরে গেল! ও আমার দেশের মাটি… …. শিকড়হীন নয়, ইমিগ্রান্টরা হচ্ছে ফলভারে নত কলম (graft) দেয়া গাছ!!!

About admin

Check Also

give1-300x76

ইমিগ্রান্ট কড়চা (CBET), আসমা খান Immigrant Diary (CBET), Asma Khan

ইমিগ্রান্ট কড়চা (CBET), আসমা খান Immigrant Diary (CBET), Asma Khan স্কুলে আমাদের পন্ডিত স্যার বাংলা …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *